বাঘায় প্রতারণার স্বীকার চার যুবক সৌদি আরবে কাটাচ্ছেন দূর্বিষহ জীবন

নিজস্ব প্রতিনিধিঃ রাজশাহীর বাঘা উপজেলার চার যুবক প্রতারণার স্বীকার হয়েছেন এমন অভিযোগ পাওয়া গেছে। ভাগ্যের চাকা ঘোরাতে নিজেদের শেষ সম্বলটুকু বিক্রি করে এমনকি ধার দেনা করে, কিস্তিতে টাকা তুলে এবং নিজের শেষ সম্বল জমিটুকু লিখে দিয়ে পাড়ি জমান সৌদি আরবে। ভালো কোম্পানিতে চাকুরী, আকর্ষনীয় মাসিক বেতন, সৌদি আরবে পৌঁছানোসহ এক বছরের আকামা।

 

এমন লোভনীয় প্রতিশ্রুতিতে ভড়কে জান রাজশাহীর বাঘা উপজেলার বাউসা ইউনিয়নের বাউসা হেদাতি পাড়া এলাকার মৃত ময়েন উদ্দিনের ছেলে হাকিবুর (৩৫), আব্দুল মজিদের ছেলে সোহেল রানা (২৭), তহির উদ্দিনের ছেলে ফয়েজ উদ্দিন (৫০) ও আবুল কালামের ছেলে আসাদুল ইসলাম (২৬)। তারা একই এলাকার মৃত ময়েন উদ্দিনের ছেলে সৌদি প্রবাসী ইব্রাহিমের মাধ্যমে সৌদি আরবে যেতে টাকা ও সম্পত্তি তুলে দেন প্রবাসী ইব্রাহিমের স্ত্রী স্বপ্নার হাতে। অনেক তালবাহানার পরে ইব্রাহিম তাদের চারজন কে নিয়ে যায় সৌদি আরবে। সৌদিতে পা রাখার পর থেকে স্বপ্ন ভাংতে শুরু করে এ-ই চার যুবকের। তিন মাস ভিসার মেয়াদ থাকায় কাজ পেয়েছিলেন একটি কোম্পানিতে বেতন পেয়েছে মাত্র ১ মাসের। বর্তমানে তাদের আকামা ও চাকরি না থাকায় খেয়ে না খেয়ে অর্ধাহারে-অনাহারে মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছে। এ ঘটনায় ভুক্তভোগীদের পরিবারের পক্ষে মিঠুন আলী বাদী হয়ে বাঘা থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। 

 

তবে এখন আকামা করে দেওয়ার বিষয়ে বলতে গেলে কোনো গুরুত্ব দিচ্ছে না ইব্রাহিম। বরং বৃহৎ অংকের টাকা ও টাকার পরিবর্তে জমি লিখে নিয়ে তাদের সাথে প্রতারণা করছে প্রবাসী ইব্রাহিম ও তার স্ত্রী স্বপ্না। এছাড়াও কৌশলে ৪ যুবককে সৌদি আরবে নিয়ে গিয়ে বিপদে ফেলেছে এমন অভিযোগ ভুক্তভোগীদের পরিবারের।

 

ভুক্তভোগীদের পরিবার সুত্রে জানা যায়, সৌদি আরবে যেতে ৪ লক্ষ টাকা করে লাগবে প্রথমে এ-ই কথা বললেও পরে জোর পূর্বক আরও ১ লক্ষ টাকা সহ জন প্রতি মোট ৫ লক্ষ টাকা নেয় প্রবাসী ইব্রাহিম-স্বপ্না দম্পত্তি। তিন জনের কাছ থেকে মোট ১৫ লাখ টাকা নেয় এবং অপরজনের কাছ থেকে ৫ লাখ টাকার পরিবর্তে ৫ কাঠা জমি নিজের নামে রেজিস্ট্রি করে নেয় ইব্রাহিমের স্ত্রী স্বপ্না বেগম। এরপর তাদের পাঠানো হয় সৌদিতে। কিন্তু আকামা ছাড়া কোন কোম্পানীতে চাকরিও করতে পারছে না। এমনকি আকামা (বৈধতা) না থাকায়  তারা খেয়ে না খেয়ে প্রায় দেড় মাস যাবৎ গৃহবন্দি অবস্থায় আছে। তারা আরো জানান, বিষয়টি ইব্রাহিমের স্ত্রী কে বললে সে খুব খারাপ ব্যবহার করছে। এলাকার বিভিন্ন গণ্যমান্য লোকজনদের কাছে জানিয়েও কোন লাভ হচ্ছে না। আমরা সবাই ইব্রাহিমের বড় ভাই প্রভাষক আবু তাহেরের হাত দিয়ে টাকাগুলো স্বপ্নাকে দিয়েছিলাম। এছাড়াও এলাকার সবাই জানে লেনদেনের বিষয়ে। তারপরও স্বপ্না এখন বলে টাকা নেয়ার প্রমাণ কী? 

 

এ বিষয়ে ফয়েজ উদ্দিন জানান, অনেক কষ্টে টাকা জমিয়ে কিনেছিলাম  ৫ কাঠা জমি। ৫ লাখ টাকা দিতে না পেরে ইব্রাহিমের স্ত্রী স্বপ্নার নামে সেই জমি লিখে দিয়ে এসেছি। এছাড়াও অন্যান্য খরচ হয়েছে আরও এক লাখ টাকা যা এনজিও থকে কিস্তিতে নেওয়া হয়েছে। মোট ৬ লাখ টাকা খরচ করে সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছি। দেশে মা হারা দুই ছেলে (শিশু সন্তান) কে ছোট ভাইয়ের স্ত্রীর কাছে রেখে এসেছি। তবে আমি এখনো কোন কাজ পাইনি। কাজ নেই, বেতন নেই, রুম থেকে বের হতে পারিনা, এক বেলা খেয়ে আছি দেড় মাস যাবৎ। বিষয়টা বারবার ইব্রাহিম কে জানালে সে কোন গুরুত্বই দিচ্ছেনা। 

 

হাকিবুর জানান,১৫ মাসের আকামাসহ মৌখিক চুক্তি হয় ইব্রাহিমের সাথে। 

 

সে রাজি হয় তখন আমি সৌদিতে যেতে ইচ্ছা পোষণ করি। আমি স্বাপ্নাকে বিশ্বাস না করে আমার বড় ভাই আবু তাহের ও তার স্ত্রীর মাধ্যমে স্বপ্নাকে পাঁচ লক্ষ টাকা দেয়। টাকা দেয়া শেষ হলে সে আামাকে সৌদিতে নিয়ে যেতে দেরি করে এ খবর আমাদের গ্রামের লোকজন জানে। আজ নিয়ে যাবে কাল নিয়ে যাবে বলে দেড় মাস কেটে যায়। এ দিকে ইব্রাহীমের স্ত্রী সৌদিতে নিয়ে গিয়ে তোকে দেখে নিবো বলে হুমকি দেয়। এর মধ্যে আমি ইব্রাহিমকে জানাই আমার আকামার ব্যবস্থা করেন সে সুধু আমাকে ঘুরাতে থাকে। আমাকে পাঁচলক্ষ টাকার বিনিময়ে পনেরো মাসের আকামা দেয়ার কথা ছিল। হটাৎ আকামা দিলে আমি আকামা পরীক্ষা করি দেখি ইব্রাহীম আমাকে তিন মাসের আকামা দিয়েছে। তাকে জানালে সে কিছুই বলেনা। এভাবে আমার ছয় মাস কেটে যায়। দেড়মাস বসে আছি ঘর থেকে পুলিশের ভয়ে আকামা না থাকায় বের হতে পারছিনা। ইব্রাহীম আমাকে আকামা ও কাজ কিছুই দিচ্ছেনা। এখন খেয়ে না খেয়েও জীবন যাপন করেছি। খুব দূরোহ জীবন যাপন চলছে। আমি ইব্রাহীম ও তার স্ত্রী স্বপ্নার বিচার চাই। 

 

সোহেল, আসাদুল ও হাকিবুল এর পরিবারের লোকজন জানান, বিভিন্ন স্থান থেকে ধার দেনা ও কয়েকটি (এনজিও) সমিতি থেকে ঋণ নিয়ে বিদেশ গেছেন তারা। ৫ মাসে মাত্র ১ মাসের বেতন পেয়েছে। এখন কোন কাজ নেই। এমনকি বাহিরে বের হতেও পারছেনা তারা। বারবার বলার পরেও আকামা করে দিচ্ছে না ইব্রাহিম। বাড়িতে প্রতিনিয়ত পাওনাদারেরা টাকা চাইতে আসছে।

 

সরেজমিনে গিয়ে ইব্রাহিমের বাড়ির মূল দরজায় তালা দেওয়া দেখতে পাওয়া যায়। বাড়িতে তার স্ত্রী স্বপ্না কে না পাওয়ায় বক্তব্য নিতে বার বার স্বপ্নার ব্যাবহৃত মোবাইল নম্বরে কল দিয়ে নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়। তাই তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। 

 

মুঠোফোনে ইব্রাহিম জানান, অভিযোগের বিষয়টি পুরোপুরি সঠিক নয়। আমি তাদের ৬ মাসের আকামা করে দিয়েছি। 

 

বর্তমানে তারা বৈধভাবে সৌদি আরবে আছে। এছাড়াও একটি কোম্পানিতে তাদের চাকরির ব্যাবস্থা করে দিয়েছি। কিন্তুু বড় ভাই আবু তাহের আমার সাথে শত্রুতার জের ধরে তাদের উস্কানী দিয়ে আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করিয়েছে। 

 

এ বিষয়ে ইব্রাহিমের আপন বড় ভাই প্রভাষক আবু তাহের বলেন, ফয়েজ, সোহেল, হাকিবুর ও আসাদুলের সৌদি আরবে আকামা না হওয়ার বিষয়টি আমি জানি। পারিবারিক ভাবে বসে এ ঘটনার নিরসন করতে চেয়ে ছিলাম। কিন্তুু ইব্রাহীম আমার কথা মানেনি। শুনেছি এ বিষয়ে থানায় অভিযোগ হয়েছে। 

 

এ ব্যাপারে পল্লী চিকিৎসক ছমির উদ্দিন জানান, সবাই একই মহল্লার হওয়ায় কোন লিখিত প্রমান রাখা হয় নি। কিন্তুু ইব্রাহিমের স্ত্রী বলে টাকা লেন দেনের কোন প্রমান আছে? তাই আমি সাদা কাগজে লেন দেনের পুরো বিষয়টি অভিযোগ আকারে লিখি। কিন্তুু সেই কাগজে কেউ স্বাক্ষর দেয়নি। 

 

বাউসা ইউনিয়নের ৪ নং ওয়ার্ড সদস্য মোহসীন আলী জানান, এ ঘটনার বিষয়ে একটি পারিবারিক শালিস হয়েছে। তাতেও কোন লাভ হয়নি।

 

বাউসা ইউনিয়ন সচিব রফি আহমেদ মুঠোফোনে জানান, এ বিষয়ে পরিষদে একটি লিখত অভিযোগ পেয়েছি। নোটিশের মাধ্যমে উভয় পক্ষকে ডেকে সমাধান করা হবে।

 

বাঘা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সাজ্জাদ হোসেন বলেন, একটি অভিযোগ পেয়েছি। অভিযোগের বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে। 

 

ইব্রাহিম ও স্বপ্নার প্রতারনার কারণে ৪টি পরিবার এখন ধ্বংসের মুখে। তাই ভুক্তভোগী পরিবার ইব্রাহিম স্বপ্না দম্পতির বিচার দাবি করেছেন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

Related posts

Leave a Comment